ইন্টারনেট হোক শিশুবান্ধব - Media and Information Literacy Initiative, Bangladesh

ইন্টারনেট হোক শিশুবান্ধব

লেখাটি শেয়ার করো

বিশ্ব এক অজানা অসুখে ভুগছে। এই অসুখের নাম কোভিড-১৯। যে অসুখের কারণে থমকে গেছে বিশ্বের সব সেক্টর। থমকে পড়েছে মানুষের চলাফেরার অবাধ স্বাধীনতা। মানুষ যেন ঘরে থাকতে থাকতে হয়ে ওঠেছে খাঁচাবন্দি বাঘের মতো। কেননা, এই অসময়ে দেখা যায় পারিবারিক কলহের জের প্রখর থেকে প্রখর আকার ধারণ করেছে। ভেঙে পড়েছে অনেক পারিবারিক বন্ধন। এমনকি পাল্টে গেছে মানুষের স্বাভাবিক চেহারাসুরতও। কিন্তু এর বিপরীত তথ্যও সুখকর। কোভিডের কারণে অনেক পরিবারে শান্তি ফিরেছে। একত্রে দীর্ঘদিন যাপন করার সুযোগ পেয়েছে। পরিবেশ পেয়েছে নতুন মাত্রা। বন্যপ্রাণী, পশু, পাখি পেয়েছে সুন্দর ও নির্মল আবহাওয়া। অনেক পরিবেশবাদীর মতে, আগামী ১০০ বছরের জন্য আবহাওয়া অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে কোভিডের ভূমিকা মনে রাখার মতো। কোভিডের কারণে স্কুল-কলেজও এখন বন্ধ। এই সময়ে শিশুদের কষ্টই সবচেয়ে বেশি। তাদের মানসিক নানা দিকেও নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করেছে ঘরবন্দি থাকতে থাকতে।

এই ঘরবন্দি জীবনে অনেকেই ইন্টারনেট ব্যবহারে আসক্ত হয়েছে। এই ইন্টারনেট একদিকে যেমন আশীর্বাদ, অন্যদিকে বয়ে নিয়ে এসেছে বিড়ম্বনা। বিশেষ করে শিশু-কিশোররাই এই বিড়ম্বনার শিকার বেশি হচ্ছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের সবদেশেই এই ইন্টারনেট ব্যবহারকারী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ব্যাপক হারে বাড়ছে। গত কয়েক মাসে এই সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়েছে। বাংলাদেশে অনলাইন জনগোষ্ঠীর গড় বয়স ক্রমেই কমছে। ৬ বছরের শিশু থেকে শুরু করে সব বয়েসের শিশু-কিশোরদের প্রতিদিন ইন্টারনেটে প্রবেশ ও ব্যবহার হচ্ছে ধারণার বাইরে। যদিও ছোট শিশুদের তুলনায় বেশি বয়সি শিশুরা অনলাইনে আসক্তির সম্মুখীন হওয়ার বেশি ঝুঁকিতে বেশি। এ প্রসঙ্গে বিশ্ব শিশুবিষয়ক সব সংস্থা সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, বাংলাদেশসহ এশিয়ায় ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ছয়-সাত থেকে ১৮ বছর বয়সি ৫০ শতাংশ শিশু অনলাইন সহিংসতা, অনলাইনে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও ডিজিটাল উৎপীড়নের শিকার হওয়ার মতো বিপদের মুখে রয়েছে।

একই সঙ্গে সংস্থাগুলো অনলাইনে শিশু ও তরুণ জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা মোকাবিলা ও প্রতিরোধে সমন্বিত পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে। ‘বাংলাদেশে শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা’ শিরোনামে ইউনিসেফ বাংলাদেশ পরিচালিত সাম্প্রতিক এক সমীক্ষার জন্য দেশের স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার ১ হাজার ২৮১ জন স্কুল-বয়সি (১০ থেকে ১৭ বছর) শিশুর ওপর জরিপ পরিচালনা করা হয়, যারা ইন্টারনেট ব্যবহার করে। বিভিন্ন ধরনের সাইবার অপরাধের মধ্যে ধর্মীয় উস্কানি দেওয়ার বিষয়টিও সমীক্ষায় উঠে এসেছে। জরিপে অংশগ্রহণকারী প্রায় ১০ শতাংশ শিশু ধর্মীয় উস্কানিমূলক বিষয়বস্তুর মুখোমুখি হওয়ার অভিযোগ করে। কিশোর বয়সিরা (১৬ থেকে ১৭ বছর) অন্য বয়সি শিশুদের তুলনায় অনেক বেশি এই ধরনের উস্কানিমূলক বিষয়বস্তুর সম্মুখীন হয়। ইউনিসেফ বাংলাদেশের সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রায় ২৫ শতাংশ শিশু (১০ থেকে ১৭ বছর বয়সি) ১১ বছর বয়সের আগেই ডিজিটাল জগতে প্রবেশ করতে শুরু করে। এ ছাড়া, শিশুদের একটি বড় অংশ (৬৩ শতাংশ) প্রাথমিকভাবে ইন্টারনেট ব্যবহারের স্থান হিসেবে তাদের নিজেদের কক্ষটিকেই ব্যবহার করে। এটা ‘বেডরুম কালচার’-এর ব্যাপকতা নির্দেশ করে, যা অপেক্ষাকৃত কম নজরদারির মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে। বাংলাদেশে উচ্চমাত্রায় অনলাইনে প্রবেশাধিকারে সুযোগ ও ব্যবহারের দিক থেকে ছেলেরা (৬৩ শতাংশ) মেয়েদের (৪৮ শতাংশ) চেয়ে এগিয়ে আছে। ইন্টারনেটে নিয়মিত সবচেয়ে বেশি যে দুটি কাজ করা হয় তা হচ্ছে, অনলাইন চ্যাটিং (বার্তা আদান-প্রদান) ও ভিডিও দেখা। প্রতিদিন গড় ৩৩ শতাংশ সময় অনলাইন চ্যাটিং এবং ৩০ শতাংশ সময় ভিডিও দেখা হয়ে থাকে।

সমীক্ষায় উঠে এসেছে যে, ৭০ শতাংশ ছেলে ও ৪৪ শতাংশ মেয়ে অনলাইনে অপরিচিত মানুষের বন্ধুত্বের অনুরোধ গ্রহণ করে। এমনকি জরিপে অংশগ্রহণকারীদের একটি অংশ তাদের নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলে সেই অনলাইন ‘বন্ধুদের’ সঙ্গে সরাসরি দেখা করার কথাও স্বীকার করে। ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রতিনিধি এডুয়ার্ড বেগবেদার বলেন, শিশু অধিকারবিষয়ক কনভেনশন গ্রহণের এবং ‘ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব’ সৃষ্টির ৩০ বছর পর সরকার, পরিবার, শিক্ষাক্ষেত্রে ও বেসরকারি খাতের জন্য শিশু ও তরুণ জনগোষ্ঠীকে ডিজিটাল নীতিমালার কেন্দ্রে রাখার এখনই সময়।

ইন্টারনেটের সবচেয়ে খারাপ দিক থেকে সুরক্ষিত রেখে সবচেয়ে ভালো দিকগুলো ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করার মাধ্যমে প্রত্যেকে ভালোর জন্য ভারসাম্য আনতে সহায়তা করতে পারি। আমাদের এখনই বুঝে নিতে হবে যে, আগামী বিশ্ব আরও প্রযুক্তিনির্ভর হবে। সেক্ষেত্রে ইন্টারনেট ব্যবহারের সঠিক কিছু নীতিমালাও বাচ্চাদের মধ্যে পজিটিভ পুষ করাতে হবে। তাদের পর্যবেক্ষণের মধ্যে রেখে ইন্টারনেটের ভালো দিকগুলো আলোচনা করতে হবে। জানিয়ে দিতে হবে গল্পের মাধ্যমে পৃথিবীর কোনো স্থানে কে কে ইন্টারনেটের সফল প্রয়োগ করে বিখ্যাত হয়ে উঠছে তারই নানা গল্প। বোঝাতে হবে, ইন্টারনেটের সঠিক ব্যবহারে একজন শিশুও কীভাবে বিখ্যাত মানুষদের মতো কাজের কাজ হতে পারে। সেক্ষেত্রে কিছু নীতিমালাও তৈরি করা দরকার পরিবার ও রাষ্ট্রকে। শিশুদের তথ্য সুরক্ষিত রাখা, এর অপব্যবহার না করা এবং এই গোপনীয়তাকে সম্মান জানানো; অনলাইন শিশুদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানের পূর্ণ প্রয়োগ এবং নিজেদের গোপনীয় বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে ঝুঁকি থেকে শিশুরা কীভাবে নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে পারে সে বিষয়ে শেখানোর জন্য বেসরকারি খাত ও সরকারের আরও জোরালো প্রতিশ্রুতি প্রয়োজন। শিশুদের ঝুঁকি কমায়, এমন নৈতিক পণ্য তৈরি ও বিপণনসহ অনলাইনে শিশুদের সুরক্ষিত রাখে, তার প্রচারণা ও প্রসার বাড়ানো। এমন ডিজিটাল প্রযুক্তির গতির সঙ্গে তাল মেলানোর জন্য প্রযুক্তির নকশায় নিরাপত্তা নীতিমালার সন্নিবেশ ঘটাতে হবে। শিশুদের জানাতে হবে ইন্টারনেটের মাধ্যমে যেহেতু বিশ্বের যেকোনো স্থান থেকে তথ্য সংগ্রহ করা যায়।

লেখাপড়া, গবেষণা, সাহিত্যচর্চার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য, বই, ইন্টারনেটের মাধ্যমে যেকোনো সময় পাওয়া সম্ভব। এটি মানুষের হাতের মুঠোয় জ্ঞানভান্ডার তথা লাইব্রেরিকে এনে দিয়েছে। পর্যটকদের প্রয়োজনীয় সব তথ্য ইন্টারনেটের মাধ্যমে পাওয়া যায়। এছাড়া ইন্টারনেটে টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসেও বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া যায়। ঘরে বসে বিশ্ববিখ্যাত সব সিনেমা-নাটক দেখা যায়, যা বিনোদনকে সহজ করেছে। বর্তমান সময়ে ইন্টারনেটের মাধ্যমে ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ সাইটগুলো যেমন ফেইসবুক, টুইটার ইত্যাদির ভালো ভালো বন্ধুত্ব স্থাপন এবং যোগাযোগ বৃদ্ধি করা যায়, সুন্দর ও শিক্ষণীয় অনেক গেমস খেলা যায়, তাই এসব কাজে যেনো সংযুক্ত হওয়ার সময় পরিবারের অভিজ্ঞদের সহায়তা গ্রহণ করে। এতে তাদের জীবনে যোগ হবে এক নতুন মাত্রা। কিন্তু এসব বিষয় শিশুদের সব সময় পজিটিভলি বোঝাতে হবে উদাহরণের মাধ্যমে।

কোনো নীতিবাচক বিষয়কে উদাহরণ হিসেবে টেনে না বোঝানোই মঙ্গল বলে মনে করি। এছাড়া এই করোনাকালীন সময়ে পরিবারের সবাইকে মনে রাখতে হবে, শিশুদের সঙ্গে যেন কোনো খারাপ আচরণ না করা। কেননা, এমনিতেই দীর্ঘদিন শিশুরা তাদের খেলার সাথিদের সঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন। তাই শিশুদের পড়াশোনার বিষয়েও চাপ না দিয়ে কৌশলের অবলম্বন করতে হবে। শোনাতে পারেন বিখ্যাত মানুষদের বড় হওয়ার পেছনে পরিশ্রম ও পড়াশোনার গুরুত্ব। বোঝাতে পারেন সময়কে কাজে লাগিয়ে কীভাবে পৃথিবী মানুষ নিজের অবস্থান শক্ত করে। তবে জোর করে কোনো কিছুই করাতে যাওয়া এখন হিতে বিপরীত হবে।

আরও লেখা পড়ো

10 Best White Label Forex Brokers 2024

Tamta’s writing is both professional and relatable, ensuring her readers gain valuable insight and knowledge. Customized your prop

ইন্টারনেটে নিরাপত্তা নিয়ে তোমার ভাবনা লিখে পাঠাও

জিতে নাও পুরষ্কার

bettilt